HWPL ইন্টারন্যাশনাল ইয়ুথ পিস প্রোগ্রাম সিউলে অনুষ্ঠিত, বাংলাদেশসহ ৪৩ দেশের অংশগ্রহণ
দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে ৪৩টি দেশের তরুণ-তরুণীরা একত্রিত হয়ে শান্তি, সহাবস্থান ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার মূল্যবোধ অন্বেষণ করেছেন। আন্তর্জাতিক এই যুব বিনিময় কর্মসূচিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন বাংলাদেশ মাইনোরিটি বুড্ডিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের (BMBA) চেয়ারম্যান শান্তিদূত ভদন্ত দীপানন্দ ভিক্ষু। কোরিয়ার ইতিহাস, যুদ্ধের স্মৃতি ও সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে অংশগ্রহণকারীরা শান্তির প্রয়োজনীয়তা ও মূল্য নতুনভাবে উপলব্ধি করেন। যুদ্ধ ও বিভক্তির স্মৃতি ধারণকারী কোরিয়া ওয়ার মেমোরিয়াল থেকে শুরু করে ইনসাদং, গোয়াংহোয়ামুন ও গিয়ংবকগুং প্রাসাদ—প্রতিটি স্থানই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তরুণদের জন্য শান্তি শিক্ষার একেকটি উন্মুক্ত শ্রেণিকক্ষে পরিণত হয়। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ECOSOC)-এর বিশেষ পরামর্শক মর্যাদাপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক সংগঠন Heavenly Culture, World Peace, Restoration of Light (HWPL) গত ১৭ থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর তিন দিনব্যাপী ‘HWPL International Youth Peace Program’ আয়োজন করে। ‘We, the Living Legacy of Peace’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এই কর্মসূচি ‘Discover’, ‘Learn’ ও ‘Act’—এই তিনটি ধাপে সাজানো হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল কোরিয়ার ইতিহাস ও সংস্কৃতির আলোকে তরুণদের মধ্যে শান্তির মূল্যবোধ সৃষ্টি করা এবং তা নিজ নিজ দেশ ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের বাস্তব শান্তি কার্যক্রমে প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করা। যুদ্ধের স্মৃতি থেকে শান্তির শিক্ষা ১৭ সেপ্টেম্বর কর্মসূচির প্রথম দিনে অংশগ্রহণকারীরা কোরিয়া ওয়ার মেমোরিয়ালের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান পরিদর্শন করেন। এর মধ্যে ছিল কোরিয়ান ওয়ার রুম, জাতিসংঘ কক্ষ, জাতিসংঘ স্মৃতিস্তম্ভ এবং ‘স্ট্যাচু অব ব্রাদার্স’। এসব স্থানের ইতিহাসের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা উপলব্ধি করেন, যুদ্ধ শুধু একটি দেশের ভূখণ্ড বা রাজনৈতিক ইতিহাসকে পরিবর্তন করে না; এটি ব্যক্তি, পরিবার ও তরুণ প্রজন্মের জীবনেও গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে অংশগ্রহণকারীদের সামনে প্রশ্ন রাখা হয়—‘আমার কাছে শান্তির অর্থ কী এবং শান্তি রক্ষায় আমি কী করতে পারি?’ এই প্রশ্নের মাধ্যমে বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নতুনভাবে সামনে আসে। ফিজির ন্যাশনাল ইয়ুথ কাউন্সিলের (NYCF) চেয়ারওম্যান মিসেস লাইসানি সেপো যুদ্ধস্মৃতিসৌধ পরিদর্শনের পর বলেন, যুদ্ধের সময় তরুণরা নিজেদের এলাকা রক্ষায় জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিল। শান্তি প্রতিষ্ঠার পথেও নানা চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনা থাকলেও দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। সংস্কৃতির মাধ্যমে বোঝাপড়া ও সম্মান ইনসাদংয়ে অংশগ্রহণকারীরা কোরিয়ার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হন। এর মাধ্যমে তারা উপলব্ধি করেন, অপরিচিত সংস্কৃতিকে বোঝার চেষ্টা থেকেই জন্ম নেয় সম্মান; আর পারস্পরিক সম্মান মানুষের মধ্যে যোগাযোগ, বিনিময় ও সহযোগিতার পথ তৈরি করে। ইরাকের পাবলিক এইড অর্গানাইজেশনের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর মি. আলওয়ান্ড তালাত জাওহার কালুরি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও ধর্মীয় পটভূমির তরুণদের জন্য নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে তারা শান্তি নিয়ে নিজেদের চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও উদ্বেগ ভাগ করে নিতে পারে। ইতিহাস থেকে দায়িত্ববোধ ও শান্তির অঙ্গীকার গোয়াংহোয়ামুন ও গিয়ংবকগুং প্রাসাদে অংশগ্রহণকারীরা ‘উত্তরাধিকার, সম্মান, দায়িত্ব, পরিবর্তন ও সম্প্রীতি’—এই পাঁচটি মূল শব্দের মাধ্যমে শান্তির অর্থ অন্বেষণ করেন। বিশেষ করে রাজা সেজং দ্য গ্রেট, জিপহিয়নজিয়ন বা ‘হল অব ওয়ার্দিজ’ এবং হানগুল বা হুনমিনজিওনগুম সৃষ্টির ইতিহাসের মাধ্যমে তারা বিশ্লেষণ করেন—একজন নেতার সিদ্ধান্ত, জ্ঞানচর্চা ও দূরদর্শিতা কীভাবে একটি সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন সৃষ্টি করতে পারে। অংশগ্রহণকারীরা পাঁচটি মূল্যবোধের মধ্য থেকে নিজেদের পছন্দের একটি নির্বাচন করেন এবং নিজ নিজ দেশে ফিরে সেই মূল্যবোধ বাস্তবায়নে কী ধরনের উদ্যোগ নেবেন, তা লিখে রাখেন। মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড অ্যান্টি-ড্রাগ অ্যাবিউজ অর্গানাইজেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) মি. অ্যান্ড্রু জুনিয়র মুইমা বলেন, যুদ্ধে তরুণদেরই পাঠানো হয়। তাই শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগেও তরুণরাই সামনের সারিতে নেতৃত্ব দিতে পারে। তিনি বলেন, ‘তরুণরা ভবিষ্যতের নেতা নয়; আমরা আজকের নেতা।’ শান্তির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে তরুণদের ভূমিকা ১৭ সেপ্টেম্বরের ‘Discover’ ধাপের পর ১৮ সেপ্টেম্বর শুরু হয় ‘Learn’ ধাপ। এদিন ‘The Role of Youth in Spreading a Culture of Peace’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় ধর্মীয় বিশ্বাস ও জাতিগত পরিচয়কে কীভাবে সহিংসতা ও সংঘাতের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা থেকে প্রতিরোধ করা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা হয়। Declaration of Peace and Cessation of War (DPCW)-এর ৮, ৯ ও ১০ নম্বর অনুচ্ছেদের আলোকে যুদ্ধ প্রতিরোধ, সংঘাত নিরসন এবং ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। এরপর অনুষ্ঠিত হয় ‘International Religious Peace Academy for Youth Leaders’। সেখানে বৌদ্ধধর্ম, কনফুসীয় দর্শন, খ্রিস্টধর্ম, ইসলাম ও হিন্দুধর্মের ধর্মগ্রন্থ ও শিক্ষার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়। এর মাধ্যমে বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি অংশগ্রহণকারীদের বোঝাপড়া আরও বিস্তৃত হয়। শেখা থেকে বাস্তব প্রয়োগ ১৮ সেপ্টেম্বরের ‘Learn’ ধাপের পর ১৯ সেপ্টেম্বর শুরু হয় চূড়ান্ত ধাপ ‘Act’। এই পর্যায়ে আগের দুই দিনে আবিষ্কৃত ও শেখা শান্তির মূল্যবোধ বাস্তব জীবনে প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। অংশগ্রহণকারীরা Youth Engagement & Peacebuilding Working Group (YEPW)-এর বিভিন্ন আঞ্চলিক কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা ও কেস স্টাডি উপস্থাপন করেন। তরুণরা কীভাবে নিজেদের উদ্যোগে শান্তি কার্যক্রম পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় আঞ্চলিক YEPW প্রকল্প বাস্তবায়নের কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হয় এবং ২০২৭ সালের কর্মপরিকল্পনা ও অংশগ্রহণকারীদের দায়িত্ব আরও সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়। শান্তির উত্তরাধিকার বহন করবে তরুণ প্রজন্ম তিন দিনের পুরো কর্মসূচিটি এমনভাবে সাজানো হয়েছিল, যাতে অংশগ্রহণকারীরা প্রথমে যুদ্ধের স্মৃতি থেকে শান্তির প্রয়োজনীয়তা আবিষ্কার করেন, এরপর বিভিন্ন সংস্কৃতির মাধ্যমে বোঝাপড়া ও সম্মান শেখেন এবং সবশেষে ইতিহাস থেকে পাওয়া দায়িত্ব ও মূল্যবোধকে বাস্তব কার্যক্রমে প্রয়োগের অঙ্গীকার করেন। HWPL-এর সেক্রেটারি-জেনারেল কাং তায়ে-হো বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা তরুণরা যুদ্ধ ও বিভক্তির এই ভূখণ্ডে এসে শান্তির প্রয়োজনীয়তা সরাসরি উপলব্ধি করেছেন। তিনি বলেন, শান্তি এমন কোনো উত্তরাধিকার নয়, যা শুধু আমরা গ্রহণ করি; বরং এটি এমন এক উত্তরাধিকার, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। তরুণ শান্তি নেতাদেরই সেই দায়িত্ব বহন করতে হবে। বেলজিয়ামের ফ্রি ইউনিভার্সিটি অব ব্রাসেলসের (VUB) আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মিসেস সারা ভারমট বলেন, ‘আমি তো শুধু একজন শিক্ষার্থী। মানুষ কেন আমার কথা শুনবে? এভাবে চিন্তা করলে কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, কোরিয়ায় অর্জিত অভিজ্ঞতা সহপাঠী ও সমবয়সীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে এবং অন্যান্য তরুণদের অংশগ্রহণে শান্তি কার্যক্রম আয়োজন করতে চান। সিউলের এই আন্তর্জাতিক যুব কর্মসূচির মধ্য দিয়ে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে একটি বিষয়ই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে শান্তি শুধু একটি ধারণা নয়; এটি একটি দায়িত্ব, একটি মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়ার মতো একটি জীবন্ত উত্তরাধিকার।
দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে ৪৩টি দেশের তরুণ-তরুণীরা একত্রিত হয়ে শান্তি, সহাবস্থান ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার মূল্যবোধ অন্বেষণ করেছেন। আন্তর্জাতিক...
ভূমিকম্পের পর আকস্মিক বন্যা ও ধস: নেপালে ২৯১ বিদেশি সহ প্রায় ৪০০ পর্যটক নিখোঁজ। আন্তর্জাতিক ডেস্ক: নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী রাসুয়া...

